নাগরিক মতামতমহানগরশিরোনাম-২

হুঁশ ফিরবে কবে?


সজীব ওয়াফি


রাজশাহী শহরের প্রবেশ মুখে, তালাইমারী চেকপোস্ট। লকডাউনের জন্য চলাচল সীমিত করতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ সদস্যরা। তিনজন যাত্রীর একটি ভ্যান। সাথে একটি ছাগল এবং ছাগলের জন্য ঘাসও আছে। উদ্দেশ্য- কোরবানি পরবর্তী বাবার বাড়িতে দাওয়াত খেতে নাইওর যাচ্ছেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুলিশ সদস্যরাও জিগ্গাসাবাদ করছেন ক্লান্তিহীন। হঠাৎ ছাগল ব্যা ব্যা করে উঠলো। পুলিশ জানতে চাইলেন ছাগল ব্যা ব্যা করে উঠলো কেন? যাত্রীদের মধ্যে ছোট শিশুটি জানালো পুলিশ যাতে ছেড়ে দেয় এ জন্য সে ছাগলকে চিমটি কেটেছে। ছাগল কেন নিয়ে যাচ্ছেন জানতে চাইলে তারা জানান বাড়িতে দেখাশোনার কেউ নেই, তাই ছাগলটিকে নিয়েই যাচ্ছেন কুটুমবাড়ি।

কোরবানি পরবর্তী এই দৃশ্য শুধুমাত্র রাজশাহীর নয়। আনাচে-কানাচে, অলিগলি, হাটে বাজারে, দোকানপাটে, পাড়া-মহল্লায় সারাদেশে এমনটি চলছে। কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। একেবারে লাগামছাড়া। সব দায়িত্ব যেন সরকারের। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসছে শুনলেই ভোঁ দৌড়। গ্রামের দিকে ফুটবল খেলা হচ্ছে আয়োজন করে। মহামারি এই অস্থির সময়টাতে মাদকের পরিবহন-বিস্তারও থামেনি। বরং লকডাউনের নিরাপত্তায় কৌশলী হয়ে অনেকাংশে তুলনামূলক বেড়েছে।

স্বাস্থ্যবিধি মানতে নুন্যতম মাস্ক পরতে অবহেলা দেখা গেছে সেই শুরু থেকেই। বেড়েছে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ঘোরাঘুরির প্রবণতা। পুলিশের কাছে মেডিকেলের খালি ফাইল হাতে ধরা পরেছে কেউ কেউ। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দূরের কথা, খাবার গ্রহণের আগে সাবান পানিতে হাত ধোয়ার অভ্যাস এখনো গড়ে উঠেনি গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে। তাদের একবাক্যে- গরিবের করোনা হয় না। অথচ গ্রামের প্রতি ঘরে ঘরে জ্বরে কাঁপতেছে, আছে খুসখুসে কাশি। চিকিৎসা কেন্দ্রে না গিয়ে বাড়িতে উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে মানুষ। অনেকে আবার চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন একেবারে অন্তিম পর্যায়।

ঈদ-উল-আযাহা উপলক্ষে ঢাকা শহর ছেড়েছে ১ কোটি ৫ লক্ষ মোবাইল কোম্পানির সিম ব্যবহারকারী। কোরবানি পরবর্তীতে যাদের আবার ফেরত এসেছে ৮ লক্ষের মতো। এইতো শুধুমাত্র ঢাকা শহরের পরিসংখ্যান, অন্যান্য শহরের কথা তো বাদই। অন্যান্য শহর হিসাবের আওতায় আনলে এই সংখ্যা ঢের বাড়বে।

করোনায় ভাইরাস প্রতিরোধে দীর্ঘ সময় পেয়েও আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। সঠিক ব্যবস্থায় ৫০ ভাগ মানুষকে না দেয়া গেছে ভ্যাকসিন, না করা গেছে অক্সিজেন প্লান্ট। উপরন্তু চট্টগ্রামের সিআরবিতে গাছ কেটে সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপের মাধ্যমে হাসপাতাল তৈরি করার হুজুগ। করোনা প্রতিরোধের নানান সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। কর্মকর্তা কর্মচারী কতৃক চিকিৎসা খাতের দুর্নীতির দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সংবাদকর্মীরা হেনস্তার স্বীকার হয়েছেন মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরায়।

করোনায় এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৪৪ জন। মারা গেছে প্রায় ২০ হাজারের কাছাকাছি মানুষ। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সর্বশেষ তিন সপ্তাহ ধরে নিয়মিত মারা যাচ্ছে দু’শয়ের কাছাকাছি লোক। আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হারে বিশ্বের শীর্ষ দশের ভিতরেও স্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। বেখেয়ালে সংখ্যা হয়ে যাচ্ছে এক একটি জীবন।

লকডাউন বাস্তবায়নে উন্নয়নশীল দেশগুলো ধাক্কা খাবে স্বাভাবিক। কঠোর লকডাউনের আগে এসকল রাষ্ট্রে নিম্নবিত্ত মানুষের খাবার পৌছানো জরুরি। এমনও হতে পারে মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরবর্তী পৃথিবী হবে দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। কারোই কোন হুঁশ নেই। সরকারের ওপর দোষ চাপিয়েই আমরা খালাস। সব দায় যেন শেখ হাসিনার! অযুুহাত দেখিয়ে অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা করছে তাদের কোন দায় নেই কেন? নাগরিকের দায় কেবল সমালোচনা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ!

মানুষকে খাদ্য এবং অর্থ সহায়তা পৌঁছে না দিয়ে আমাদের মতো গরিব দেশে লকডাউন বা শাটডাউন বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। অতঃপর লকডাউনের কড়াকড়ি জোরদার করতে হবে। নাগরিকদেরও হতে হবে সচেতন। নচেৎ বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্রমেই অরক্ষিত হয়ে পরেছে আমাদের ভবিষ্যৎ। করোনা প্রতিরোধে নীতিনির্ধারক, আমলা-কর্মচারী সহ সকল পেশাদারিত্ব পর্যায়ের দায়িত্বশীল আচরণও আবশ্যক।

লেখক: সংগঠক ও বিশ্লেষক

Close