নাগরিক মতামতশিরোনাম-২শিশু বার্তা

জলবায়ু পরিবর্তনঃ শিশুদের উপর প্রভাব, ঝুঁকি এবং করণীয়

মোঃ লাবিব হক

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম একটি সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এর সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষণীয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তন্মধ্যে ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধ্বসের মাত্রাবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পূর্বে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর হলেও বর্তমানে ২ থেকে ৩ বছর পরপরই বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে। ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্‌ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার হওয়া অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব শিশুদের ওপর রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমান করে যে সারাবিশ্বে ৮৮% পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা ও নদী ভাঙনের মতো নানা দূর্যোগের প্রতিকুল প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের শিশুদের ওপর। সংখ্যার হিসেবে তা ১ কোটি ৯০ লক্ষেরও বেশী ও সবচাইতে ঝুঁকিতে রয়েছে ১ কোটি ২০ লক্ষ শিশু। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলছেন, “জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের সবচাইতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা তাদের শিশুদের পর্যাপ্ত খেতে দিতে পারছে না, তাদের সুস্থ রাখতে পারছে না। তাদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।” দারিদ্রতার কারণে তখন অনেক শিশুদেরই শিক্ষা গ্রহণ হুমকির মুখে পড়ছে তাদের অনেককেই বাইরে কাজ করতে হচ্ছে এবং মেয়েদের বাল্যবিবাহ হয়ে যাচ্ছে।

দি ল্যানসেটে স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর পর্যালোচনায় শিশুদের জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা সবচেয়ে খারাপভাবে প্রভাবিত হিসেবে বলা হয়েছে। শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়িঘর ধ্বংস হওয়া, খাদ্য নিরাপত্তার প্রতি হুমকি এবং পারিবারিক জীবীকা হারানোর মাধ্যমে আক্রান্ত হয়। শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবগুলোর মধ্যে আছে:প্রাণহানি এবং আঘাত, তাপজনিত রোগ, পরিবেশের ক্ষতিকারক উপাদানের সংস্পর্শে আসা; সংক্রামক ও উষ্ণ তাপমাত্রায় অন্যান্য বিদ্যমান রোগ। মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষণীয় বিষয় যেমন আঘাত পরবর্তী চাপজনিত ব্যাধি (পিটিএসডি), বিষন্নতা এবং দুশ্চিন্তা, ঘুম সংক্রান্ত ব্যাধি, জ্ঞানীয় ঘাটতি, শিক্ষাগ্রহণে সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে তাই সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তাই সকল শ্রেণী-পেশার সকল স্তরের মানুষের একসাথে ঐক্যের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কাজ করতে হবে। শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাল্যবিবাহ রোধে সচেতন হতে হবে। বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির স্বল্প ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ, তাই শিশুদের ওপর প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করা হয়। আমাদের সকলের উচিত নিজেদেরকে পৃথিবীর এই উন্নয়নে নিয়োজিত করা। এর মাধ্যমে হয়তো আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে পারব।

তথ্যসুত্রঃ

উইকিপিডিয়া, বিবিসি নিউজ এবং ভয়েস অফ আমেরিকা।

Close