শিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ভয়াল রাত ২৫ মার্চ (নাটক)


নূর-ই-হাফিজা খানম

চরিত্র-
১, বঙ্গবন্ধু
২. রেনু
৩.কামাল
৪. জামাল
৫. রাসেল
৬. তাজ উদ্দিন
৭. সৈয়দ নজরুল ইসলাম
৮. কামারুজ্জামান
৯. ক্যাপ্টেন মনসুর আলী
১০. কর্ণেল ওসমানী
১১. টেলিফোনের ওপারের ব্যক্তি
১২. ওয়্যারলেসের ওপারের ব্যক্তি
১৩. ৫/৬ জন পাক সেনা অফিসার
১৪. অন্যান্য অনেক নেতাকর্মী

সিকোয়েস ১
সময়- রাত ৮টা
স্থান- ৩২ নম্বরের বৈঠকখানা

চরিত্র বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন, কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কর্ণেল ওসমানী, ফোনের ওপারের ব্যক্তি ও অন্যান্য
[৩২ নম্বরের বৈঠকখানায় নেতৃবৃন্দের সাথে বঙ্গবন্ধু বসে আলোচনা করছেন। রাত আটটা, সারা ঢাকা বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন করে নিয়ন্ত্র বাঙালির উপর পশ্চিম পাকিস্থানীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে অপারেশান সার্চ লাইট চলছে-
রাত ৮টায় টেলিফোন বেজে উঠলো-ক্রিং ক্রিং ক্রিং
বঙ্গবন্ধু- ফোন তুলে হ্যালো
ওপারের ব্যক্তি- হ্যালো স্যার
বঙ্গবন্ধু- কি হয়েছে বল?
ওপারের ব্যক্তি- স্যার পাকিস্থানি আর্মি ঢাকায় সব বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিরীহ লোকদের হত্যা করছে।
বঙ্গবন্ধু- কি বলছো এসব?
ওপারের ব্যক্তি- স্যার দয়া করে এক্ষুনি আপনি বাড়ি ত্যাগ করে অন্যত্র আত্মগোপন করুন।
বঙ্গবন্ধু- দেশের এই সংকটময় পরিস্থতিতে তা কি করে সম্ভব?
ওপারের ব্যক্তি- স্যার, আপনাকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে একদল কমান্ডো বাহিনী অগ্রসর হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু- নেতৃবৃদন্দ সকলে বঙ্গবন্ধুর দিকে চেয়ে আছে, সকলের মধ্যে চাপা উত্তেজনা, দিশেহারা ভাব। বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিন, কামারুজ্জামান, নজরুল ইসলাম, ওসমানী ও মনসুর আলীকে নিয়ে বেরিয়ে বারান্দায় গেলেন।

সিকোয়েন্স-২
সময় – রাত
স্থান- ৩২ নম্বরের বৈঠকখানা থেকে বারান্দা

চরিত্র- বঙ্গবন্ধু , তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, কর্ণেল ওসমানী ও অন্যান্য
বঙ্গবন্ধু উপর্যুক্ত পাঁচ জনকে নিয়ে উত্তরের বারান্দায় এলেন সকলে বঙ্গবন্ধুকে আত্মগোপনে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন কিছু মিডট কথা বলবে।
তাজউদ্দীন- আপনি ভীত নন সে তো আমরা জানি কিন্তু এ সময় একটু সতর্ক থাকাও দরকার।
সকলে- এখন পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ
বঙ্গবন্ধু- মৃত্যর ভয় আমি করি না
ক্যাপ্টেন মনসুর- ওরা একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে
বঙ্গবন্ধু- কিন্তু আমি পালিয়ে গেলে ইয়াহিয়া কুৎসা রটাবে
কামারুজ্জামান- আপনাকে দেশের মানুষের এখন বড় প্রয়োজন
বঙ্গবন্ধু- আমি আত্মগোপন করলে দেশে-বিদেশে নানারকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে।
সৈয়দ নজরুল- আমরা আত্মগোপনে খাচ্ছি, কিন্তু আপনার কথা ভেবে একটুও নিশ্চিন্তে থাকতে পারনো না
বঙ্গবন্ধু- তোমাদের উপর আমার অনেক আস্থা, যে দায়িত্ব দিলাম তা যথাযথ ভাবে পালন করতে হবে মনে রেখো ভায়েরা আমার
চারজন বঙ্গবন্ধুকে চারদিক থেকে ধরে হু হু করে কেদেঁ উঠল, বঙ্গবন্ধু ওদের জোর করে বের করে দিলেন।
বঙ্গবন্ধু- (পকেট থেকে একটি কাগজ পকেট থেকে বের করে ওসমানীর হাতে তুলে দিতে দিতে)নীচু স্বরে বড় দায়ীত্বটা আমি আপনাকে দিলাম
ওসমানী- সম্মতী সূচক মাথা নেড়ে।জ্বি
বঙ্গবন্ধু- ভারত-রাশিয়া সর্বাত্বক সাহায্য করবে
ওসমানী- হা সূচক মাথা নাড়লেন
বঙ্গবন্ধু- আপিনি আপনার প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা দিয়ে ছেলেদের পরিচালনা করবেন।
ওসমানী- আপনি দেশের মহান নেতা, আপনার উপর দেশের মানুষের অনেক ভরসা
বঙ্গবন্ধু- আপনি ঘোষণা দেওয়ার সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আপনিও যান আত্মগোপন করুন।
ওসমানী- আপনিওি আমার সাথে চলুন, এসময় আপনার বাড়িতে থাকা ঠিক হবে ন।
বঙ্গবন্ধ- আমি মারা গেলে জাতির মনোবল বাড়বে
ওসমানী- সকলেই যখন আমরা দেশের স্বার্থের আত্মগোপনে যাচ্ছি-তখন আপনাকে একা রেখে যেতে মন সায় দেয় না
বঙ্গবন্ধু- আপনি আর দেরি করবেন না প্লিজ। অনেক বড় দায়িত্ব আপনার কাঁধে ওসমানিকে জড়িয়ে
(ওসমানীর প্রস্থান) ধরলেন।

সিকোয়েন্স-৪
সময়-রাত
স্থান- বঙ্গবন্ধুর বৈঠকখানা
চরিত্র- বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ

বঙ্গবন্ধু- ওসমানীকে বিদায় দিয়ে, বৈঠকখানায় প্রবেশ করে সকলের উদ্দেশ্যে
“তোরাও সব সরে পড়, খুব সাবধানে থাকবি, যে যেখানে থেকে পারো প্রতিরোধ গড়ে তোল, মারবি কিন্তু মরবি না”
(সকলের একে্ একে প্রস্থান)

সিকোয়েন্স-৫
সময়-রাত
স্থান-বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের শোবার ঘর
চরিত্র- বঙ্গবন্ধু, রেণু, কামাল, জামাল,রাসেল

রাসেল বিছানায় ঘুমিয়ে আছে, পাশে রেণু বসে। সোফায় জামাল, কামাল বসে আছে। বঙ্গবন্ধু চিন্তিত,গম্ভীর,ঘরের মেঝেতে পায়চারী করছেন। একবার রাসেলের দিকে দেখছেন, একবার জামাল কামালের দিকে দেখছেন। একবার রেণুর দিকে দেখছেন।
বঙ্গবন্ধু-(পায়চারী করতে করতে) এই অবস্থায় যে কি করি; নাহ!
(রেনুর দিকে তাকিয়ে)
আমি একবার ছাদে গিয়ে দেখে আসি:
তোমরা ঘরেই থাকো।
(বঙ্গবন্ধুর প্রস্থান)
রেণু- তোমরা ভয় পেওনা বাবারা আমি তোমাদের সাথে আছি।

সিকোয়েন্স-০৬
সময়-রাত
স্থান- বঙ্গবন্ধুর ছাদে উঠার সিঁড়ি
চরিত্র-বঙ্গবন্ধু

দ্রুতপদে বঙ্গবন্ধু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেন। কিছুক্ষণ পর নামছেন।

সিকোয়েন্স- ০৭
সময় –রাত
স্থান- বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘর
চরিত্র-বঙ্গবন্ধু, রেণু, জামাল, কামাল, রাসেল।

রাসেল বিছানায় শোয়া, জামাল , কামাল সোফায় বসা। বঙ্গবন্ধু দ্রুত পায়ে এসে সোফায় জামাল, কামালের পাশে বসলেন, রেণু বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে দাড়ালেন।
বঙ্গবন্ধু- উফ! কি হৃদয় বিদারক দৃশ্য
চারিদিকে অন্ধকারের মধ্যে গুলির শব্দ
রেণু- গুলির শব্দ?
বঙ্গবন্ধু- চারিদিক থেকে ভেসে আসছে কি নিদারুন চিৎকার আর কান্নার শব্দ, দা্ও দা্ও করে জ্বলছে আগুন!
(সকলেই অত্যন্ত ভীত ও চিন্তিত)

সিকোয়েন্স-০৮
সময়-রাত
স্থান- ৩২ নম্বরের শোবার ঘর
চরিত্র-বঙ্গবন্ধু,রেণু, জামাল, কামাল, রাসেল।

রাসেল বিছানায় শোয়া, জামাল, কামাল সোফায় বসা।বঙ্গবন্ধু সোফায় বসা সামনের টেবিলে কিছু কাগজ ্ও কলম।

রেণু একটি জ্বলন্ত হ্যারিকেন এনে সোফার টেবিলে রাখলেন।

বঙ্গবন্ধু- গম্ভীর ও চিন্তিত মুখে কাগজ-কলম নিয়ে কিছু লিখলেন। এবং কাগজ হাতে ওয়্যারলেস করছেন।

বঙ্গবন্ধু- চট্টগ্রাম ওয়্যারলেস বিভাগ
ওপারের জন- জ্বি স্যার
বঙ্গবন্ধু- শোন বাংলাদেশ এখন স্বাধীন। আমরা আর পরাধীন নই।(বঙ্গবন্ধু হাতে ধরা কাগজটি পড়লেন-মিউট)
আমার এই বার্তাটি চট্টগ্রাম আ্ওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীকে খুব দ্রুত পৌঁছে দা্ও।
্ওপারের জন-ঠিক আছে, স্যার।
বঙ্গবন্ধু –এ্ই বার্তাটি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য সকল ব্যবস্থা জহুর আহমেদ চৌধুরী করবে।
ওপারের জন-জ্বি স্যার
বঙ্গবন্ধু- আমার আহবান তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তো।
ওপারের জন-জ্বি স্যার
বঙ্গবন্ধু-ওভার

সিকোয়েন্স-০৯
সময়-রাত
স্থান-৩২ নম্বরের শোবার ঘর
চরিত্র-বঙ্গবন্ধু, রেণু, কামাল,কামাল, রাসেল।

বঙ্গবন্ধু চিন্তিত মুখে ঘরে পায়চারি করছেন মনে মনে (গোপন টেলিফোনে আমাকে আত্মগোপনে যা্ওয়ার অনুরোধ করলো, অন্যান্য নেতা কর্মীরা্ও তাই চায়।
কিন্তু-আমি কিভাবে এমন কাজ করতে পারি?

রেণু বিছানায় রাসেলের পাশে বসে, কামাল জামাল সোফায় বসে, বঙ্গবন্ধু কামাল জামালের পাশে সোফায় বসলেন-কামাল জামালের গায়ে হাত রাখলেন, মনেমনে

বঙ্গবন্ধু-‘আমি আত্মগোপন করলে ওরা দেশের সমস্ত মানুষকেই হত্যা করবে।’
বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন, রাসেল ও রেণুর দিকে তাকিয়ে মনেমনে
বঙ্গবন্ধু-‘আমি মরি তা্ও ভালো, আমার প্রিয় দেশবাস রক্ষা পাক।’

সিকোয়েন্স-১০
সময়-রাত ১.৩০
স্থান-৩২ নম্বরের শোবার ঘর
চরিত্র-বঙ্গবন্ধু, রেণু, কামাল,কামাল, রাসেল।

বিদ্যুৎ নেই, টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন, গুলির শব্দ আসছে।জানালায় গুলি লাগছে। একটা গুলি শোবার ঘরে পড়লো।
বিছানায় শুয়ে রাসেল, রেণু কামাল জামাল কে নিয়ে সোফায় বসা। পাশেই ইজি চেয়ারে বঙ্গবন্ধু বসা।

বঙ্গবন্ধু- তুমি বাচ্চাদের নিয়ে মেঝেতে বোস।
রেণু-(উঠে রাসেলকে বিছানা থেকে তুলে এনে মেঝেতে জামাল কামাল ্ও রাসেলকে কোলে নিয়ে বোসলেন।
বঙ্গবন্ধু- উঠে দাঁড়িয়ে রেণুর দিকে বিদায় সূচক দৃষ্টি বিনিময় করে বেরিয়ে গেলেন।

সিকোয়েন্স-১১
সময়-রাত ১.৩০
স্থান-৩২ নম্বরের নিচের বাহির বারান্দা।
চরিত্র-বঙ্গবন্ধু ও কয়েকজন পাক সেনা অফিসার।

বঙ্গবন্ধু নীচতলার বাহির বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার-

বঙ্গবন্ধু-তোমরা গুলি বন্ধ কর। আমি তো এখানে দাড়িয়ে আছি
তোমরা গুলি করছো কেন?
কি চা্ও তোমরা?
চারিদিকে থেকে ক‘জন পাক সেনা অফিসার বেয়নেট উঁচিয়ে বঙ্গবন্ধুর চর্তুদিকে ঘিরে দাঁড়ালো-
একজন অফিসার বঙ্গবন্ধুকে ধরে
অফিসার- এই, একে মেরে ফেল না!
বঙ্গবন্ধুকে ধরে টেনে হিঁচড়ে বন্দুকের গুঁতো মারতে মারতে বারান্দা থেকে নামাতে লাগলো।
বঙ্গবন্ধু-তোমরা আমাকে টানছো কেন?
আমি যাচ্ছি তো! আমার তামাকের পাইপ নিতে দা্ও।
(্ওরা বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দিলেন, বঙ্গবন্ধু ভেতরে চলে গেলেন)

সিকোয়েন্স-১২
সময়-রাত
স্থান-বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘর
চরিত্র-বঙ্গবন্ধু, রেণু, কামাল,কামাল, রাসেল।

রাসেল মেঝেতে শুয়ে আছে। কামাল, জামাল বেগম মুজিব দাঁড়িয়ে আছে-
বঙ্গবন্ধু-প্রবেশ করে বিছানার পাশের টেবিল থেকে তামাকের পাইপটি নিলেন।
রেণ- কিছু কাপড়-চোপড় সহ একটা স্যুটকেস বঙ্গবন্ধুর হাতে দিলেন।
বঙ্গবন্ধু-বেগম মুজিবকে বিদায় সূচক দৃষ্টি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন-
তখন চারিদিকে আগুন জ্বলছে-

Close