নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

জাতীয় নেতা শহিদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান হেনা








ওয়ালিউর রহমান বাবু



১৯২৩ সনের ২৬ জুন রাজশাহী জেলার তৎকালীন নাটোর মহকুমার বাগাতীপাড়ার মালঞ্চী রেলওয়ে ষ্টেশনের পাশের্^ তমাল তলা বাজারের কাছে নূরপুর গ্রামে নানা আব্বাস সরকারের বাড়িতে জন্ম জাতীয় নেতা শহিদ আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের (এ. এইচ. এম কামারুজ্জামান হেনা)। তাঁর নানির নাম জামিলা। দাদা রাজনীতিবিদ সমাজসেবী হাজী লাল মোহম্মদ সরদার সে সময় কলকাতায় ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি রাজশাহী জেলা সদরে ফিরে তাঁকে নিয়ে এলেন তাদের রাজশাহী জেলা সদরের কাদিরগঞ্জের পারিবারিক বাড়িতে। এই নামটি তারই দেওয়া। সকলের মাঝে সুগন্ধ ছড়াবেন এই প্রত্যাশায় দাদী শাহজাদী নাম দিলেন হেনা, হেনা অর্থ সুগন্ধী।
রাজশাহী জেলা সদরের কাদিরগঞ্জ পাড়ার পারিবারিক বাড়িতে তাঁর বেড়ে উঠা শুরু। এক সময় চাচা আব্দুস সামাদের কাছে নিলেন শিক্ষায় হাতে খড়ি। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় এই স্কুলের শিক্ষক তাঁর এক ফুফা চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে বদলী হবার সময় তাঁকে সাথে নিয়ে গেলেন। কিশোর অবস্থায় এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান হেনার ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে রাজশাহীতে ফিরে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হলেন। এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে গিয়ে সেখান থেকে অর্থনীতিতে অনার্স করে, রাজশাহী জেলা সদরে ফিরে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে আইনে ভর্তি হলেন। এ সময় রাজশাহী পৌরসভার তৎকালীন ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেন। আইনে ডিগ্রী অর্জন করে রাজশাহী কোর্টে আইন পেশায় সংপৃক্ত হয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে। কর্তব্য পরায়ন, নিষ্ঠাবান হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর কাছের জন ও নিজ যোগ্যতায় জননেতা হয়ে গেলেন তিনি তাঁর উর্দু বক্তব্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসাধারণকে আকৃষ্ট করে ফেলেন। বঙ্গবন্ধুকে সেখানে পরিচিত করতে ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৫ সনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চা, গাওয়া বন্ধের প্রস্তাব করা হলে তিনি সাংসদ মজিবুর রহমানের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে জোরালো প্রতিবাদ করেন।
১৯৬৭ সনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের বিতর্ক অনুষ্ঠানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অধিকার, যমুনা নদীতে ব্রিজ নির্মাণসহ বিভিন্ন দাবী উত্থাপন করেন। ১৯৬৯-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করে গণআন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সনে তিনি তাঁর স্ত্রী জাহানারা কামারুজ্জামানকে প্রকাশক ও সরদার আমজাদ হোসেনকে সম্পাদক করে রাজশাহী জেলা সদরের রানীবাজার এলাকায় তাঁর বন্ধু মোসলেম শাহ্র বাড়িতে ‘সোনার দেশ’ সংবাদপত্রের অফিস করে ১৯ জুন সংবাদপত্রটি প্রকাশ করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ‘সোনার দেশ’ অধিকারের কথা, বঞ্চনার কথা প্রকাশ করে পাঠকদের দারুনভাবে উজ্জিবিত করল। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের লেখা এই সংবাদপত্রে সে সময় ছাপা হয়। সরদার আমজাদ হোসেন সাংসদ নির্বাচিত হওয়ায় তিনি ভাষাসৈনিক সাইদ উদ্দিন আহমেদকে এই দায়িত্ব দিলেন। আহমেদ সফিউদ্দিন সহ একঝাঁক তরুণ সাংবাদিক এই সংবাদপত্রের সাথে সম্পৃক্ত হলেন। ১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শপথ নিলেন। পাকিস্তানের সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সৃষ্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধু যে কয়েকদিন সরকারের সাথে আলোচনায় অংশ নিলেন তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথেই ছিলেন। ২৫ মার্চ গণ হত্যা শুরু হলে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া নির্দেশমত তিনি মুক্তিযুদ্ধ কে তরান্বিত করতে ভূমিকা রেখে ঝুঁকি উপক্ষো করে বগুড়ার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠিক ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট গাজিউল হকের বাড়িতে তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মনি সহ উপস্থিত হলে বগুড়া জেলার তৎকালীন জয়পুরহাট মহকুমার পাঁচবিবি অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মীর শহিদ মন্ডল তাদের হিলিতে নিয়ে গিয়ে সার্কেল অফিসার একে ফেরদৌস সাহেবের বাড়িতে রাখলেন। সে রাতে তারা পাকিস্তান সৈন্যদের নির্যাতন প্রত্যক্ষ করলেন। পরের দিন তারা সীমান্ত পার হলেন। ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার মুজিব নগরে (বৈদ্যনাথ তলায়) প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্টগণ ত্রাণ ও পুর্নবাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে শপথ নিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের ‘উদয়ন’ প্রেস থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুর রহমানকে সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাট্যব্যক্তিত্ব কলাম লেখক বাবু প্রশান্ত সাহাকে সাংবাদিকতা সহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে ‘সোনার বাংলা’ প্রকাশ করেন। এ নামে আরেকটি সংবাদপত্র থাকায় নাম পরিবর্তন করে রাখলেন ‘বাংলার কথা’। ‘বাংলার কথা’-র জন্য একটি পরিচালনা কমিটি করে দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুর রহমান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাট্যব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক বাবু প্রশান্ত সাহার মাধ্যমে সংবাদপত্রটি কলকাতায় তাঁর কাছে গেলে তিনি উচ্ছ্বাস নিয়ে অফিসের সকলকে বলতেন ‘দেখো আমার অঞ্চল থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র’। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর তিনি তাঁর স্ত্রী জাহানারা কামারুজ্জামানকে প্রকাশক করে ঢাকা থেকে ‘দৈনিক জনপদ’ প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁর ব্যস্ততার জন্য তা আর চলমান রাখা যায়নি। বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব সহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সনের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবার সহ অন্যান্যদের হত্যার পর জাতীয় নেতা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ও অর্থ মন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সহ বন্দি অবস্থায় তাঁকে ঢাকা জেলা খানায় ৩ নভেম্বর নির্মম ভাবে তাকে হত্যা করে। লাশ দুই দিন ঢাকা জেল খানায় রাখা হলো। হেলিক্পটার না পেয়ে পারিবারিক ভাবে ট্রাক বা বাসে লাশ রাজশাহীতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তে, জাতীয় নেতা শহিদ এ এচ এম কামারুজ্জামান হেনার স্ত্রী জাহানারা কামারুজ্জামান ৬ নভেম্বর দুই মেয়ে রিয়া ও চুমকিকে সাথে নিয়ে হেলিকপ্টারের ডান দিকে ক্ষত কপাল, রক্ত মাখা ঝুলে থাকা হাঁটু, কালো কম্বল ভাঁজ করে ঝাঝরা করে দেওয়া বুকে জড়ানো শহিদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান হেনার লাশ রাজশাহীতে নিয়ে এলেন। কড়া নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে পারিবারিক গোরস্থানে লাশটি দাফন করে সাত দিন পাহারা বসানো হলো। সাহস করে সেখানে দুই একজন যেতে পেরেছিলেন। এভাবে ৬ নভেম্বর শেষ বিদায় জানানো হলো বঙ্গবন্ধুর কাছের জন জাতীয় নেতা শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান হেনাকে। যারা সেখানে যেতে পারেননি তারা দুর থেকে অঝোরে ঝরা অশ্রু দিয়ে তাদের প্রিয়জন এ ব্যক্তিত্বকে বিদায় দিলেন। তিনি তোসামাদী তদবীর পছন্দ করতেন না। তিনি বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল করলেও অন্যান্যদের সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিলো। এই কারনে তিনি সকলের হেনা ভাই। তিনি ছিলেন শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অনুরাগী ব্যক্তিত্ব। পিছিয়ে পড়া বঞ্চিত গনমানুষের কথা সবসময় ভাবতেন এবং তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করতেন।

রাজশাহী কলেজের প্রক্তন ছাত্র জাতীয় নেতা শহিদ এ এইচ এম কামারুজামান হেনার নামে একটি ভবনের নাম করণ করা হয়েছে। সামাজিক কর্মকান্ডে শহিদ কামারুজ্জামান ফাউডেশন কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্টান ,কেন্দ্রীয় উদ্যান, জেলা পরিষদ মিলানায়তন, গোরহাঙ্গা রেল চত্বর তার নামে নাম করণ করা হয়েছে। নানা সংগ্রাম স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া অঙ্গনসহ সামাজিক কর্মকান্ডে অবদান রাখা এই ব্যক্তিত্বকে প্রজন্মদের কাছে পরিচিত করিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট্যদের ভুুমিকা নিতে হবে। জাতীয় নেতা শহীদ এ এইচ এম কামারুজামান হেনা সহ তাঁর সাথে ঢাকা জেলখানায় হত্যা হওয়া জাতীয় তিন নেতার প্রতিও শ্রদ্ধা।


তথ্যসূত্রঃ জাতীয় নেতা শহিদ এএমএইচ কামারুজ্জামান হেনার স্ত্রী জাহানারা কামারুজ্জামান (সাপ্তাহিক দুনিয়া‘র সম্পাদক সুলতানা শারমিনের নেওয়া সাক্ষাৎকার) বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ জনক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকট আব্দুল হাদি, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক প্রতিমন্ত্রী সাবেক সাংসদ জিনাতুন্নেসা তালুকদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার মেজর সিরাজউদ্দিন লষ্কর, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মীর শহিদ মন্ডল (পাঁচবিবি) , বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার আব্দুল মান্নান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, ভাষা সৈনিক সিনিয়র সাংবাদিক সাইদ উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় নেতা শহিদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান হেনার বড় মেয়ে সাবেক ছাত্রনেতা মমতাজ ফেরদৌস পলি, সিনিয়র সাংবাদিক আহমেদ সফিউদ্দিন ‘সাপ্তাহিক দুনিয়া’, ‘রাজশাহীর প্রতিভা’।



Close